ডেঙ্গু জ্বর কি? ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ || Dengue Fever

বর্তমানে জ্বরের লক্ষণ অনেক বেশি দেখা দিচ্ছে। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অনেকে মারা যাচ্ছে। সাধারণ জনগণ ডেঙ্গু জ্বরকে নিয়ে আতঙ্কে রয়েছে। তবে সঠিক সময়, সঠিক নিয়ম মেনে চললে এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। সুতরাং আমাদের জানতে হবে ডেঙ্গু জ্বর কি, কেন হয়, এর প্রতিরোধ, চিকিৎসা ইত্যাদি সম্পর্কে। আজ আমরা ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পর্যালোচনা করব।

ডেঙ্গু জ্বর কি? ডেঙ্গু জ্বরের  লক্ষণ,  চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

ডেঙ্গু জ্বর কি, কিভাবে ছড়ায় এবং কামড়ানোর কত সময় পর জ্বর হয়

ডেঙ্গু হচ্ছে এক ধরনের ভাইরাস আর এই ভাইরাস থেকেই ডেঙ্গু জ্বর হয়ে থাকে। ডেঙ্গি নামক এই ভাইরাসটি এডিস ইজিপ্টাই নামক মশার মাধ্যমে ছড়ায়। কোনো ব্যক্তি যদি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত থাকে এবং এমন সময় যদি অন্য কোনো জীবাণুবাহী এডিস মশা সেই ব্যক্তিকে কামড়ায় তাহলে সেই মশাটিও ডেঙ্গু জ্বরের ভাইরাস বাহী মশায় পরিণত হবে। এভাবে একজন থেকে আরেক জন ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকে। এই ডেঙ্গু মশা কামড়ানো ব্যক্তি ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়।

আরও পড়ুনঃ ঢাকা বাংলাদেশের কার্ডিওলজি/হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের তালিকা

ডেঙ্গু জ্বর কখন হয় ও কাদের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে

গরম এবং বর্ষার সময় ( মে থেকে শুরু করে সেপ্টেম্বর ) পর্যন্ত এই সময়ে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বেশি লক্ষ্য করা যায়। মশার যে লার্ভা আমরা দেখি তা শীত কালে দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকতে পারে। সবথেকে বেশি বর্ষা কালে ডেঙ্গু ভাইরাস বাহিত মশার উৎপত্তি হয়ে থাকে। আমরা খবরে শুনতে পাই শহরে মশার প্রকোপ বেশি। এটা হওয়াও স্বাভাবিক কারণ শহরে ড্রেনে, বাড়ির ছাদে জমে থাকা পানি ইত্যাদি জায়গায় অনেক পানি আবদ্ধ থাকে সেখান থেকে এই এডিস মশা তার বংশ বিস্তার লাভ করে। শহরে যেহেতু মশার প্রাদুর্ভাব বেশি তাই স্বাভাবিক ভাবেই এই শহর এলাকার বাসিন্দা ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত বেশি হয়ে থাকে। গ্রামে এই মশার আক্রমণ কম হয় তাই গ্রামের মানুষ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত কম হয়।

ডেঙ্গুর ধরন ও জ্বরের লক্ষণসমূহ

ডেঙ্গু ভাইরাস হয় ৪ ধরনের। তাই স্বাভাবিক ভাবেই ডেঙ্গু জ্বর ও ৪ বার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একাধিক বার যাদের ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে তাদের জন্য ডেঙ্গু জ্বর ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে থাকে।

ডেঙ্গুর ক্লাসিকাল জ্বর:

  • ক্লাসিকাল ডেঙ্গু জ্বরে প্রচন্ড জ্বর এবং সাথে শরীরে প্রচন্ড ব্যথা অনুভূত হয়।
  • ক্লাসিকাল জ্বরের মাএা ১০৫° ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়ে থাকে।
  • পেটে ব্যথা হয়ে থাকে।
  • শরীরের হার, মাংসপেশিতে অনেক ব্যথা হয়।
  • এই ক্লাসিকাল জ্বরে শরীরে ব্যথা হওয়ার জন্য এই জ্বরের আরেক নাম দেওয়া হয়েছে " (ব্রেক বোন ফিভার)"।
  • জ্বর হওয়ার ৪ বা ৫ দিনের সময় সারা শরীর জুড়ে লালচে দানা দেখা যায়, যাকে বলা হয় স্কিন র‌্যাশ।
  • বমি হতে পারে।
  • ৪/৫ দিন জ্বর থাকার পরে কারও ক্ষেত্রে ২ বা ৩ দিন পর আবারও জ্বর আসে। যাকে"( বাই ফেজিক ফিভার বলে)"।

ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বরসমূহ

ডেঙ্গুর এই হেমোরেজিক জ্বর রোগীর জন্য জটিল একটা বিষয়। ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বরে ক্লাসিকাল জ্বরের লক্ষণের পাশাপাশি বেশ কিছু সমস্যার দেখা পাওয়া যায়।

জ্বরের লক্ষণ

শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্ত পড়তে দেখা যায়। যেমন নাক,মুখ,মাড়ি ও দাত, কফের সঙ্গে, রক্তবমি, কালো পায়খানা, পায়খানার সাথে রক্ত,চোখ থেকে রক্ত পরতে পারে। নারীদের বেলায় অসময়ে ঋতুস্রাব অথবা রক্তক্ষরণ হতে পারে এবং রক্তক্ষরণ শুরু হলে তা অনেক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির কিডনিতে আক্রান্ত হয়ে (রেনাল ফেইলিউর) ইত্যাদি জটিলতা দেখা দিতে পারে।

ডেঙ্গু শক সিনড্রোম

ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হচ্ছে ডেঙ্গু জ্বরের আরেকটি মারাত্মক রুপ। ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বরের সঙ্গে সার্কুলেটরি ফেইলিউর হয়ে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হয়।

লক্ষণ সমূহ

  • হঠাৎ করেই রক্তচাপ কমে যেতে পারে।
  • শরীরে হাত পা ও অন্যান্য অংশ ঠান্ডা হয়ে যায়।
  • রোগীর জ্ঞান হারানোর সম্ভাবনা থাকে।
  • রোগীর প্রস্রাবের সমস্যা হতে পারে। প্রস্রাব কমে যায়।

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

এই ডেঙ্গু জ্বরের যেহেতু কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই তাই জ্বরের উপসর্গ অনুযায়ী সাধারণ চিকিৎসা যথেষ্ট হবে। তবে জ্বরের কারণে যদি অস্বাভাবিক কিছু লক্ষ করা যায় তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। রক্তপাত, জন্ডিস, প্রস্রাবের পরিমাণ কম, অতিরিক্ত ক্লান্তি, ব্যথা,বমি হওয়া ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিলে ডাক্তার দেখাতে হবে।

ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা

ডেঙ্গু জ্বর সাধারণত ১০/১২ দিনের মধ্যে আপনা আপনি ঠিক হয়ে যায়। তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সেই অনুযায়ী বিশ্রাম নিতে হবে।

জ্বরের কারণে খাওয়ায় অরুচি হবে এটা স্বাভাবিক। এতে চিন্তার কিছু নেই। তরল খাবার পানিও খেতে হবে। যেমন : শরবত, ডাবের পানি ইত্যাদি। প্রয়োজনে শিরার মাধ্যমে সেলাইন দেওয়া যেতে পারে।

ডেঙ্গু জ্বর হলে কিছু টেস্ট করাতে হয়। সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী ডেঙ্গু জ্বর নির্ণয় পরীক্ষার খরচ কমানো হয়েছে। আগামী এক মাস সকল সরকারি হাসপাতালে মাএ ৫০/- টাকা এবং বেসরকারি হাসপাতালে ১০০/- টাকা দিয়ে ডেঙ্গু জ্বরের পরীক্ষা করা হবে।

ডেঙ্গু জ্বর কি? ডেঙ্গু জ্বরের  লক্ষণ,  চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

ডেঙ্গু প্রতিরোধ

ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধের মূল বিষয় হচ্ছে এডিস মশার বিস্তার কমানো। এডিস মশার বিস্তার কমাতে পারলে অনায়াসে ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারবে না।এডিস মশার বিস্তার কমাতে সরকারের পাশাপাশি আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা যদি নিজেদের মতো করে সর্বোচ্চ সুরক্ষার ব্যাবস্থা গ্রহণ করি তাহলে এডিস মশাব বিস্তার কমানো সহজ হয়ে যাবে। আমাদের বাড়িতে জমে থাকা পানি আমরা আমাদের নিজ দ্বায়িত্বে সপ্তাহে ৩ দিনের এক দিন ফেলে দিব। বাড়ির আশপাশের জঙ্গল কেটে পরিষ্কার রাখতে হবে। পানিতে কেরোসন তেল দিয়ে রাখতে হবে ফলে মশার যে লার্ভাগুলো পানিতে থাকে তা মারা যাবে।নিজে যাখন রাতে ঘুমাতে যাব তখন মশারী টানিয়ে নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করব। মশা মারার যে সকল কয়েল বাজারে পাওয়া যা সেগুলো ব্যাবহার কারা যেতে পারে। বাচ্চাদের যাখন স্কুলে বা খেলা করতে পাঠাবো তখন হাফপ্যান্ট না পরিয়ে ফুলপ্যান্ট পরিয়ে বায়রে যেতে দিব। তাছাড়া বাজারে এখন অনেক ধরনের লিকুইড পাওয়া যায় যা হাতে পায়ে মাখলে মশা দুরে থাকে। সুতরাং আমরা আমাদের সচেতনতাকে কাজে লাগিয়ে এডিস মশার সংক্রমণ রোগ ডেঙ্গু থেকে সুরক্ষিত থাকতে পারি।

উপসংহার

ডেঙ্গু জ্বর হলে চিন্তার কিছু নেই সচেতনতার সাথে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নিয়ম মেনে চললে এই ডেঙ্গু ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। বাড়িতে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করতে হবে এডিস মশার বিস্তার কমাতে। আপনার সচেতনতা হবে ডেঙ্গু জ্বর থেকে বাচার মূল হাতিয়ার।

আরও পড়ুনঃ চুল কেনো পড়ে ? চুল পড়া প্রতিরোধে করণীয় ও অকরণীয়

Previous Post Next Post